* শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানো নিয়ে যা বললেন চিফ প্রসিকিউটর
* ভারত ও বাংলাদেশের বন্দি চুক্তি অনুযায়ী আইনে যা আছে
* শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পাদিত বন্দি বিনিময় চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়া হয়েছে। এ লক্ষে নোট ভারবালও পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন
বৈষম্যরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বর্তমানে তিনি ভারতেই রয়েছেন। তবে ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলই মেনে নিতে পারছে না। শুধু তাই নয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতারাও শেখ হাসিনাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কথা বলছেন বিভিন্ন সভা-সেমিনারে। অবশেষে গণহত্যার অভিযোগে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল সোমবার জুলাই গণহত্যায় অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এরআগে ১৭ অক্টোবর শেখ হাসিনাসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির মধ্য দিয়ে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
জানা গেছে, বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ীই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরানো যাবে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার পতন ঘটে। পরে তিনি জনরোষ থেকে বাঁচতে ভারতে পালিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি সেখানেই আছেন। তার দলের অনেক নেতাও দেশটিতে আশ্রয় নিয়েছেন। জুলাই গণহত্যার অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুই শতাধিক হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা হয়েছে। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা গ্রেফতার হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার হবে। ইতোমধ্যে একটি মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এবং আরেক মামলায় তার পরিবারের সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতাসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে ট্রাইব্যুনাল। এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলাও দায়ের হয়েছে। দেশে-বিদেশেই প্রতিনিয়তই মামলা দায়ের হচ্ছে তার বিরুদ্ধে। একইসঙ্গে গণহত্যার অভিযোগেও তদন্ত চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে (আইসিজে)। এ পরিস্থিতিতে অন্তবর্তীকালীন সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরানো নিয়ে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস ব্রিফিংয়ে বারংবার প্রশ্ন উঠছে হাসিনার ভারতে অবস্থানকে কেন্দ্র করে।
শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠি: জুলাই গণহত্যায় অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সোমবার দুপুরে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের এই তথ্য জানিয়েছেন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্দি বিনিময় চুক্তি আছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়েছে ঢাকা। তৌহিদ হোসেন বলেন, আমরা তাকে যে বিচারব্যবস্থার জন্য ফেরত চেয়েছি, এটা আমরা তাদের (ভারতকে) জানিয়েছি। এ বিষয়ে আমরা ভারতকে নোট ভারবাল পাঠিয়েছি। এর আগে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছিলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে ফেরাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ফেরাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা: শেখ হাসিনাকে ফেরাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সোমবার বিজিবি সদরফতরে বিজিবি দিবস উপলক্ষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথ বলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার বিষয়ে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছন, ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছি। এক্সট্রা অডিশন করার জন্য, এটি প্রক্রিয়াধীন। কোন উপায়ে শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে ভারতের বন্দী বিনিময় চুক্তি আছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী হবে।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানো নিয়ে যা বললেন চিফ প্রসিকিউটর: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে ইন্টারপোল এবং বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির মাধ্যমে দেশে ফেরানোর চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। গত ১৮ নভেম্বর ১৩ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের পর শুনানিতে বিচারকের প্রশ্নে তিনি এ কথা বলেন। শুনানিতে ট্রাইব্যুনাল জানতে চান, শেখ হাসিনা কোথায়? তাখন তাজুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আছেন। তবে ইন্টারপোল এবং বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির মাধ্যমে তাকে দেশে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। এ সময় চিফ প্রসিকিউটর বলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ড দিয়ে শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধ শুরু হয়। ব্লাকআউট করে শাপলা চত্বরে হেফাজতের ওপর গণহত্যাসহ আওয়ামী শাসনামলে সব মানবতাবিরোধী অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন শেখ হাসিনা। আর এই ১৩ আসামি ছিলেন তার সহযোগী। তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে শাসনামলে এমন কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধ নেই যেটা শেখ হাসিনা করেননি। আর উপস্থিত এই আসামিরা এসব অপরাধ সংগঠনে সহযোগিতা করে গেছেন। সর্বশেষ ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গণহত্যার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা প্রলম্বিত করতে চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা। পরে জুলাই-আগস্ট গণহত্যা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এক মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
পিটিআইকে যা বলেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস: গত ৫ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম পিটিআইয়ের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার কথা বলেছেন অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শেখ হাসিনা দিল্লির সেফ হাউজে বসে যেসব নির্দেশনা পাঠাচ্ছেন তা নিয়েও বিরক্তি প্রকাশ করেন উপদেষ্টা। জনমনে একটাই প্রশ্ন, অন্তবর্তীকালীন সরকার চাইলেই কি ভারত হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে? এ নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে। অনেকে মনে করছেন বাংলাদেশ-ভারত বন্দি বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে ‘দ্য কনভারসেশন’ ৫ সেপ্টেম্বও তাদের এক প্রতিবেদনে বলছে, বন্দি বিনিময় চুক্তিতে একটি বিষয় উল্লেখ আছে। সেটি হলো রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো মামলা হলে কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করা যাবে না। আর এ বিষয়টি কাজে লাগিয়েই ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতিও জানাতে পারে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো মামলা হলে কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করা যাবে না থাকার সঙ্গে আবার এই চুক্তিতে এটাও উল্লেখ আছে-হত্যাচেষ্টা, হত্যা, অপহরণ ও হত্যায় উস্কানি দেওয়া অপরাধ রাজনৈতিক মামলা হিসেবে বিবেচিত হবে না। হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব মামলা করা হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই এই ধারায় পড়েছে। হাসিনাকে ভারত যদি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর মর্যাদা প্রদান করে, সেক্ষেত্রে হাসিনাকে ফেরানো কঠিন হবে। কেননা কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীকে ফিরিয়ে দিতে ভারতের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। কিন্তু ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার নতুন সম্পর্ক জোরদারে হাসিনা ইস্যু ভারতের জন্য বড় অস্বস্তির বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশের বন্দি চুক্তিতে যা আছে:ভারত ও বাংলাদেশ ২০১৩ সালে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা ২০১৬ সালে সংশোধিত হয়। এই চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে পলাতক আসামিদের দ্রুত এবং সহজে বিনিময়ের জন্য গৃহীত হয়েছে। বিশেষ করে, এটি ভারতীয় পলাতকদের, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যদের বাংলাদেশে লুকিয়ে থাকার প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশও জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) এর মতো সংগঠনের কারণে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিল, যেখানে তাদের অপারেটররা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের মতো রাজ্যে লুকিয়ে ছিল। এই পরিস্থিতিতে, চুক্তিটি উভয় দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০১৫ সালে এই চুক্তির ফলে ভারত সফলভাবে ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ আসামের (উলফা) শীর্ষ নেতা অনুপ চেটিয়াকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রত্যর্পণ করতে সক্ষম হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশও ভারতকে আরও কিছু পলাতক হস্তান্তর করেছে। চুক্তির মূল দিক হলো, ভারত ও বাংলাদেশ এমন ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের জন্য সম্মত হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, অভিযোগ আনা হয়েছে অথবা যাদের বিরুদ্ধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এমন সব অপরাধ, যার সর্বনিম্ন সাজা এক বছরের কারাদণ্ড। এর মধ্যে আর্থিক অপরাধও অন্তর্ভুক্ত। অপরাধটি প্রত্যর্পণযোগ্য হতে হলে দ্বৈত অপরাধের নীতি প্রযোজ্য হতে হবে, অর্থাৎ অপরাধটি উভয় দেশে শাস্তিযোগ্য হতে হবে। অতিরিক্তভাবে, চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে যে, “প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের কমিশনে সহযোগী হিসাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বা সহায়তা, প্ররোচনা, প্ররোচনা বা অংশগ্রহণ” করার ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ মঞ্জুর করা হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো, যার হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যদি ‘রাজনৈতিক প্রকৃতি’র হয়, তাহলে সেই অনুরোধ খারিজ করা যাবে। তবে, কোন কোন অপরাধের অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক’ বলা যাবে না, সেই তালিকাও বেশ লম্বা। এর মধ্যে হত্যা, গুম, অনিচ্ছাকৃত হত্যা ঘটানো, বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো এবং সন্ত্রাসবাদের মতো নানা অপরাধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই চুক্তি ভারতের এবং বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ভিত্তি প্রদান করে, যা তাদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অপরাধ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

গণহত্যার অভিযোগ
শেখ হাসিনাকে ফেরাতে তোড়জোড়
- আপলোড সময় : ২৩-১২-২০২৪ ০৯:৫৭:২৮ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৪-১২-২০২৪ ১২:৩০:২৫ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ